অনিয়ম-দুর্নীতিতে সরকারের কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ
মো.শাহজাহান বাশাররাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নকলনবিশ মো. গিয়াসউদ্দিন। সংশ্লিষ্ট সূত্র, ভুক্তভোগী ও সেবাগ্রহীতাদের দাবি, সরকারি কর্মকর্তা না হয়েও তিনি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। এ কারণে অনেকেই তাকে ‘বিকল্প সাব-রেজিস্ট্রার’ নামে অভিহিত করেন।অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে গিয়াসউদ্দিন পুরো অফিসে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। দলিল অনুসন্ধান, নকল উত্তোলন, রেকর্ড যাচাই, দলিল নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবায় সরকার নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ আদায়, বহিরাগত দালালদের দৌরাত্ম্য এবং নানা অনিয়মের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে কেন্দ্র করে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারের বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অত্যন্ত মূল্যবান আবাসিক বা বসতভিটার জমিকে দলিলে ‘নাল জমি’ বা কৃষিজমি হিসেবে উল্লেখ করে কম মূল্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করা হচ্ছে। এতে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ৩ মে সম্পাদিত ৩৪৫৯ নম্বর সাব-কবলা দলিলের তথ্য সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ১০.৬৬ কাঠা মূল্যবান আবাসিক জমি হস্তান্তরের সময় দলিলে সেটিকে ‘নাল জমি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ঘটনায় সরকার বিপুল পরিমাণ নিবন্ধন ফি ও কর থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ ঘটনায় নকলনবিশ গিয়াসউদ্দিনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।আরও অভিযোগ রয়েছে, অফিসের রেকর্ডরুমে বিধি-বহির্ভূতভাবে বহিরাগতদের প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া হয়। দলিল অনুসন্ধান ও নকল উত্তোলনের নামে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে যে অর্থ আদায় করা হয়, তার সঙ্গে সরকারি ট্রেজারিতে জমাকৃত অর্থের মিল পাওয়া যায় না বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিটি ধাপেই অলিখিত ঘুষের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি দলিল নিবন্ধিত হলেও এলাকার জমির উচ্চমূল্যের কারণে প্রতিটি নিবন্ধন থেকেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরকারি রাজস্ব আদায়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালচক্রের যোগসাজশে মালিকানার ইতিহাস যথাযথভাবে যাচাই না করেই মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে জাল কাগজপত্র ও অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে দলিল নিবন্ধন করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রকৃত মালিকরা পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতায় পড়ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পত্তি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন।সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে গিয়াসউদ্দিন অফিসে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় উচ্চপর্যায়ে তার শক্তিশালী যোগাযোগ ছিল এবং সে সময় তিনি রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন। সরকার পরিবর্তনের পরও রহস্যজনকভাবে তিনি বহাল তবিয়তে থেকে একই সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।এদিকে, সুশাসন ও ভূমি প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যদি এ ধরনের অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা শুধু সরকারি কোষাগারের জন্যই নয়, বরং দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা, সম্পত্তির নিরাপত্তা এবং জনগণের আস্থার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।এ পরিস্থিতিতে গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাম্প্রতিক দলিল নিবন্ধন, জমির শ্রেণি পরিবর্তন, ট্রেজারিতে রাজস্ব জমার হিসাব, নকল উত্তোলন ও সার্চ ফি আদায়ের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের উৎস তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নিবন্ধন অধিদপ্তর এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।প্রতিবেদন প্রকাশের আগে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে নকলনবিশ মো. গিয়াসউদ্দিন এবং সাব-রেজিস্ট্রার মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুনের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।