সময় বেলা

জাতীয়

মাইজভান্ডার যেখানে মন থেমে যায় হৃদয় কথা বলে সাংবাদিক শাহজাহান বাশার

কিছু কিছু জায়গা শুধু মানচিত্রের একটি বিন্দু নয়; কিছু জায়গা মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে মিশে যায়। সেখানে মানুষ যায় শুধু দেখার জন্য নয়, যায় অনুভব করতে। যায় নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে একটু থামাতে, মনের ভার কিছুটা হালকা করতে, আত্মার প্রশান্তি খুঁজতে।চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার তেমনই একটি নাম—যে নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুফি সাধনা, আধ্যাত্মিকতা, মানবপ্রেম, ভক্তি, স্মৃতি ও দীর্ঘ ঐতিহ্য। বহু মানুষের কাছে মাইজভান্ডার দরবার শরিফ শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়; এটি শান্তির একটি আশ্রয়, ভালোবাসার একটি ঠিকানা এবং আত্মিক প্রশান্তি খোঁজার একটি পরিচিত নাম।ব্যস্ত জীবনের কোলাহল, মানুষের জীবনের নানা দুঃখ-কষ্ট, হতাশা, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও কেউ যখন মাইজভান্ডারের পথে পা বাড়ান, তখন তার সঙ্গে থাকে এক ধরনের প্রত্যাশা—হয়তো এখানে এসে কিছুটা শান্তি পাওয়া যাবে। হয়তো কিছু সময়ের জন্য নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা যাবে। হয়তো প্রার্থনার মধ্যে মনকে একটু স্থির করা যাবে।এই অনুভূতিই মাইজভান্ডারের সবচেয়ে বড় শক্তি।মাইজভান্ডারী আধ্যাত্মিক ধারার সুসংগঠিত বিকাশ উনবিংশ শতাব্দীতে গাউছুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারীর মাধ্যমে। দরবারের নিজস্ব ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, তিনি ১৮২৬ সালে মাইজভান্ডারে আগমন করেন এবং পরবর্তীতে সেখানে আধ্যাত্মিক সাধনা ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন।ক্রমে তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা, শিক্ষা ও মানবিক আদর্শকে কেন্দ্র করে মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতে শুরু করেন তাঁর সান্নিধ্য লাভের আশায়। সেই ধারাবাহিকতায় মাইজভান্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—মাইজভান্ডারী তরিকার দৃশ্যমান ও প্রামাণ্য ইতিহাস মূলত উনবিংশ শতাব্দী থেকে সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। তাই মাইজভান্ডারকে ‘৪৫০ বছরের পুরোনো দরবার’ বলার পরিবর্তে উপমহাদেশের দীর্ঘ সুফি-আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার সঙ্গে মাইজভান্ডারের সম্পর্ককে তুলে ধরা অধিকতর ঐতিহাসিকভাবে সতর্ক ও গ্রহণযোগ্য।কারণ কোনো একটি দরবারের বয়সের চেয়েও বড় হলো তার দর্শন, মানুষের ওপর তার প্রভাব এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা তার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য।সুফিবাদের অন্যতম সৌন্দর্য হলো—আত্মশুদ্ধির সঙ্গে মানবপ্রেমের সম্পর্ক।নিজেকে পরিশুদ্ধ করা, অহংকার থেকে দূরে থাকা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা, অন্যের কষ্টকে অনুভব করা এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে জীবনকে অর্থবহ করার শিক্ষা সুফি দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।মাইজভান্ডারী ঐতিহ্যেও মানবকল্যাণ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।এখানে একজন মানুষ তার পরিচয়, অর্থনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক মর্যাদা নিয়ে আসেন না; তিনি আসেন একজন মানুষ হিসেবে। কেউ আসে দোয়া করতে, কেউ আসে মানসিক প্রশান্তির আশায়, কেউ আসে আধ্যাত্মিক সাধনার টানে। আবার কেউ হয়তো শুধু মাইজভান্ডারের পরিবেশটুকু অনুভব করতে আসেন।এই বহুমাত্রিক মানুষের সমাগমই মাইজভান্ডারকে একটি আলাদা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবহ দিয়েছে।এই প্রশ্নের উত্তর সবার কাছে এক নয়।কারও কাছে এটি পবিত্র স্থান। কারও কাছে আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র। কারও কাছে পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য। কারও কাছে ভালোবাসা ও ভক্তির জায়গা। আবার কারও কাছে এটি এমন একটি স্থান, যেখানে কিছু সময় নীরবে বসে নিজের জীবনকে ফিরে দেখা যায়।মানুষের জীবন সবসময় সহজ নয়। প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই থাকে না বলা কিছু কথা, কিছু দুঃখ, কিছু ব্যর্থতা, কিছু প্রত্যাশা এবং কিছু প্রার্থনা।সেই অপ্রকাশিত অনুভূতিগুলো নিয়েই মানুষ কখনো কখনো দরবারের পথে হাঁটে।হয়তো সে কোনো অলৌকিক সমাধান খুঁজছে না। সে শুধু একটু শান্তি চায়।আর সেই শান্তির অনুভূতিই মাইজভান্ডারের সঙ্গে বহু মানুষের আবেগকে যুক্ত করেছে।মাইজভান্ডারের আধ্যাত্মিক পরিবেশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জিকির, দোয়া, মিলাদ, ওরশ ও ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক নানা আয়োজনকে ঘিরে মানুষের সমাগম।বিশেষ দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্ত ও অনুসারীরা এখানে সমবেত হন। তখন মাইজভান্ডার পরিণত হয় মানুষের এক বিশাল মিলনস্থলে।কেউ সাদা পোশাকে, কেউ সাধারণ পোশাকে—বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির মানুষ এক জায়গায় এসে মিলিত হন। তাদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য হয়তো আলাদা, কিন্তু অনুভূতির জায়গায় একটি মিল রয়েছে—শান্তির আকাঙ্ক্ষা।এমন দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের বাহ্যিক পরিচয় যতই আলাদা হোক, অন্তরের শান্তির প্রয়োজন সবারই আছে।সময়ের সঙ্গে মাইজভান্ডারকে ঘিরে যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগকালে সহযোগিতা, মেধাবৃত্তি, সামাজিক সচেতনতা ও বিভিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে মাইজভান্ডারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততার কথাও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়।এখানেই আধ্যাত্মিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে—আধ্যাত্মিকতা যদি মানুষের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না আনে, তবে তার সামাজিক তাৎপর্য সীমিত হয়ে যায়।একজন মানুষ যদি দরবারে গিয়ে ফিরে এসে অন্য মানুষের প্রতি আরও সহনশীল হন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করেন, অহংকার কমিয়ে মানবিক হন—তবেই আধ্যাত্মিক শিক্ষার বাস্তব অর্থ প্রকাশ পায়।বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সঙ্গেও মাইজভান্ডারের নাম উচ্চারিত হয়েছে।মুক্তিযুদ্ধের সময় মাইজভান্ডারকে ঘিরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল মাইজভান্ডারে অনুষ্ঠিত ওরশকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত লাল-সবুজ পতাকা প্রদর্শনের ঘটনাও বিভিন্ন লেখায় ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।ইতিহাসের এমন ঘটনা মাইজভান্ডারের আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলের পাশাপাশি তার সামাজিক ও জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গেও একটি যোগসূত্র তৈরি করে।আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যখন প্রযুক্তি মানুষের দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে মনের দূরত্ব বাড়িয়েছে।মানুষের হাতে যোগাযোগের অসংখ্য মাধ্যম, কিন্তু অনেক মানুষই ভেতরে ভেতরে একাকী। চারপাশে মানুষের ভিড়, অথচ মনের কথা বলার মানুষ কমে যাচ্ছে।অর্থ, প্রতিযোগিতা, সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক বিভাজন, পারস্পরিক অবিশ্বাস—সবকিছুর ভিড়ে মানুষ কখনো কখনো ভুলে যায়, জীবনের শেষ সত্যটি হলো মানবতা।এই জায়গাতেই সুফি দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে সামনে আসে।মানুষকে ভালোবাসা, অন্যের প্রতি সহনশীল হওয়া, অহংকার কমানো, নিজের ভুল স্বীকার করা, সৃষ্টিকর্তার প্রতি আত্মসমর্পণ এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা—এই মূল্যবোধগুলো কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়; সব সময়ের জন্য প্রয়োজনীয়।মাইজভান্ডারকে শুধু স্থাপনা দিয়ে বোঝা যায় না।এর ইতিহাস বইয়ের পাতায় আছে, কিন্তু এর অনুভূতি মানুষের হৃদয়ে।এর আধ্যাত্মিকতা বক্তব্যে আছে, আবার নীরবতার মধ্যেও আছে।এর ঐতিহ্য অতীতের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু এর আবেদন বর্তমানেও রয়েছে।একজন মানুষ যখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মাইজভান্ডারে পৌঁছান, তখন তার সঙ্গে থাকে নিজের জীবনের অসংখ্য গল্প। সেই গল্পের কিছু সুখের, কিছু দুঃখের, কিছু ব্যর্থতার, কিছু আশার।দরবারের আঙিনায় দাঁড়িয়ে হয়তো সে কিছুক্ষণ নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকায়।হয়তো মনে মনে বলে—জীবনটা আরও সুন্দর হোক।মনটা আরও শান্ত হোক।মানুষের প্রতি ভালোবাসা আরও বাড়ুক।এই প্রার্থনাই হয়তো মাইজভান্ডারের সবচেয়ে সুন্দর দিক।বর্তমান সময়ে যখন ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি হয়, তখন সুফি ঐতিহ্যের মানবিক শিক্ষা নতুন করে স্মরণ করা প্রয়োজন।ধর্ম মানুষকে যদি ভালো মানুষ হতে শেখায়, তবে সেটিই তার সৌন্দর্য। আধ্যাত্মিকতা যদি মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করে, তবে সেটিই তার সার্থকতা।মাইজভান্ডারের দীর্ঘ ঐতিহ্য থেকে তাই যে শিক্ষা সবচেয়ে বেশি সামনে আসে, তা হলো—মানুষকে ভালোবাসা, মানুষের পাশে থাকা এবং নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা।কারণ পৃথিবীতে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মাজার, দরবার—সবই মানুষের আত্মিক শান্তির অনুসন্ধানের বিভিন্ন প্রকাশ। কিন্তু সব পথের শেষ কথা যদি মানবতা হয়, তবে সেই মানবতাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।মাইজভান্ডার হয়তো কারও কাছে একটি দরবার, কারও কাছে একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, কারও কাছে একটি ঐতিহাসিক স্থান। কিন্তু অসংখ্য মানুষের কাছে এটি তার চেয়েও বেশি কিছু।এটি স্মৃতির জায়গা।এটি ভক্তির জায়গা।এটি আত্মশুদ্ধির জায়গা।এটি ভালোবাসার জায়গা।সবচেয়ে বড় কথা—এটি শান্তি খোঁজার একটি জায়গা।সময় বদলাবে, প্রজন্ম বদলাবে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলাবে। কিন্তু মানুষের অন্তরের শান্তির প্রয়োজন কখনো শেষ হবে না।আর যতদিন মানুষ অশান্ত পৃথিবীর ভেতর একটু প্রশান্তি খুঁজবে, যতদিন মানুষ ভালোবাসার কাছে ফিরতে চাইবে, ততদিন মাইজভান্ডারের মতো আধ্যাত্মিক স্থানগুলোর আবেদনও থেকে যাবে।মাইজভান্ডার তাই শুধু একটি নাম নয়—এটি অনেক মানুষের কাছে একটি অনুভূতি।যেখানে মানুষ যায় শান্তি খুঁজতে, আর ফিরে আসে হৃদয়ে একটু বেশি ভালোবাসা নিয়ে।

মাইজভান্ডার যেখানে মন থেমে যায় হৃদয় কথা বলে সাংবাদিক  শাহজাহান বাশার