সময় বেলা

রাজনীতি ও সামাজিক পরিচয়ের বাইরে তাঁর আরেক পরিচয়—একজন সমাজসেবক,ত্যাগে গড়া মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর অনন্য পথচলা



রাজনীতি ও সামাজিক পরিচয়ের বাইরে তাঁর আরেক পরিচয়—একজন সমাজসেবক,ত্যাগে গড়া মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর অনন্য পথচলা
রাজনীতি ও সামাজিক পরিচয়ের বাইরে তাঁর আরেক পরিচয়—একজন সমাজসেবক,ত্যাগে গড়া মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর অনন্য পথচলা

একজন মানুষের জীবনের সাফল্যকে আমরা সাধারণত অর্থ-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব দিয়ে বিচার করি। কিন্তু এমন কিছু জীবন আছে, যেগুলোর হিসাব করতে হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন মাপকাঠিতে। কতটা সম্পদ নিজের জন্য জমিয়েছেন—তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তিনি কতজন মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করেছেন, কতটি পরিবারের সন্তান শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে এবং একটি জনপদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তার শ্রম ও উপার্জন কতটা ভূমিকা রেখেছে। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামের মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনকে সেই ভিন্ন মাপকাঠিতে দেখলে সামনে আসে একজন প্রবাসীর দীর্ঘ সংগ্রাম, ব্যক্তিগত ত্যাগ এবং মানুষের জন্য কিছু করার এক অনবরত প্রচেষ্টার গল্প। উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েই জীবিকার সন্ধানে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। শৈশবেই হারিয়েছিলেন বাবাকে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে বড় সন্তান হিসেবে সংসারের বাস্তবতা তাকে খুব অল্প বয়সেই বুঝে নিতে হয়েছিল। নিজের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দীর্ঘায়িত করার সুযোগ না পেলেও পরবর্তী জীবনে অন্যদের শিক্ষার পথ প্রশস্ত করাকেই তিনি যেন নিজের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য করে নেন। কাতার থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক—প্রবাসজীবনের বিভিন্ন সময়ে তাকে জীবিকার জন্য নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে। ট্যাক্সিক্যাব চালিয়েছেন, ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করেছেন, নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে শ্রম দিয়েছেন। কিন্তু এসব কাজের আয়ের সঙ্গে তার আরেকটি হিসাব চলেছে নীরবে—কীভাবে সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে মানুষের জন্য কাজে লাগানো যায়। ১৯৬৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ও মোসাম্মাৎ আশেদা খাতুন চৌধুরী দম্পতির ঘরে জন্ম নেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রথম। মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯৭৪ সালে বাবা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী মারা যান। বাবার মৃত্যুতে পরিবারটির ওপর নেমে আসে অনিশ্চয়তা। মায়ের সংগ্রামী জীবন, ছোট ভাই-বোনদের ভবিষ্যৎ এবং সীমিত সামর্থ্যের সংসার খুব কাছ থেকে দেখেছেন মোশাররফ। আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় কোনোভাবে চলতে থাকে তাদের পরিবার। এই সময়ের অভিজ্ঞতাই তার পরবর্তী জীবনের চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ১৯৮৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর জীবিকার সন্ধানে কাতারে পাড়ি জমান তিনি। এরপর শুরু হয় তার দীর্ঘ প্রবাসজীবন। বিদেশের মাটিতে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি দেশের মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছাটিও ধরে রাখেন। ১৯৮৯ সালে দেশে ফিরে ধান্যদৌল গ্রামে বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেন আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়। একটি প্রত্যন্ত এলাকার শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরির এই উদ্যোগই পরবর্তী সময়ে তার দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রার ভিত্তি তৈরি করে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এরপর ১৯৯৪ সালে মা ও দাদির নামে প্রতিষ্ঠা করেন আশেদা-জোবেদা ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। শিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৯ সালে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সদরে প্রতিষ্ঠা করেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। বর্তমানে কলেজটিতে ১০টি বিষয়ে অনার্স পড়ানো হয় এবং প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়ন করছে। একই বছর উপজেলা সদরে প্রতিষ্ঠা করেন আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ। বর্তমানে সেখানে পাঁচ শতাধিক ছাত্রী পড়াশোনা করছে। মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এরপর ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মুমু রোহান কিন্ডার গার্টেন। প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটি তুলনামূলকভাবে কম সামর্থ্যের পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়। ফলে কয়েক দশকের ব্যবধানে ধান্যদৌল গ্রাম থেকে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সদর পর্যন্ত একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে তার উদ্যোগে। এসব উদ্যোগকে শুধু ভবন নির্মাণ বা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর মূল তাৎপর্যটি ধরা পড়ে না। কারণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা মানে শুধু একটি ভবন তৈরি করা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরিবার, অবকাঠামো, প্রশাসন এবং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। মোশাররফ হোসেনের উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও তাই শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বিচার করার সুযোগ রয়েছে। তার শিক্ষানুরাগের সূত্র খুঁজতে গেলে অবশ্য আরও কয়েক দশক পেছনে যেতে হয়। পরিবারের পূর্ববর্তী প্রজন্মের মধ্যেই ছিল শিক্ষার প্রতি এমন একটি দায়বদ্ধতা। তার বাবার দাদা মরহুম সিরাজ খান চৌধুরী ১৯৩৭ সালে নিজ গ্রাম ধান্যদৌলে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেই সেখানে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৭ সালে মোশাররফের বাবা মরহুম আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী রাঙামাটির মতো দুর্গম এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের এলাকা থেকে শিক্ষক নিয়ে গিয়ে সেখানে শিক্ষাদানের ব্যবস্থাও করেন তিনি। পরিবারের এই শিক্ষাবিষয়ক ঐতিহ্য মোশাররফের চিন্তা ও কর্মজীবনে প্রভাব ফেলেছে। তিনি নিজেও বলেছেন, মূলত বাবার স্কুল গড়ার স্বপ্নকে তিনি একে একে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি তিনি। জীবিকার প্রয়োজনে বছরের পর বছর দেশের বাইরে অবস্থান করলেও নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন এবং এগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার লক্ষ্য ছিল প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কেবল নামমাত্র টিকে না থাকে, বরং শিক্ষার মান ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দিক থেকেও এগিয়ে যায়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, তার প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে এমপিওভুক্ত হয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় আসে। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত রয়েছেন তিনি। শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের কিছু প্রতিফলন দেখা যায়। ২০১৪ সাল পর্যন্ত মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সেরা ২০টি কলেজের তালিকায় ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ২০১৭ সালে কলেজটির উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজে পাসের হার ছিল ৯৮ শতাংশ এবং আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়ে পাসের হার ছিল ৮৬ শতাংশ। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শিক্ষার মান বিচার করতে শুধু পরীক্ষার ফলাফলই একমাত্র মানদণ্ড নয়; শিক্ষকতার মান, অবকাঠামো, শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যও গুরুত্বপূর্ণ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই তার উদ্যোগের মূল্যায়ন করা যেতে পারে। শিক্ষা খাতের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবাতেও রয়েছে তার সহযোগিতার নজির। ২০১০ সালে ব্রাহ্মণপাড়া ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণে তিনি এক বিঘা জমি দান করেন। স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এর বাইরে অসচ্ছল মানুষের সহযোগিতা, গৃহহীনদের ঘর নির্মাণ, মসজিদ নির্মাণসহ বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তার সহযোগিতার কথা স্থানীয়রা জানান। তার জনহিতকর কর্মকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ঘটনাগুলোর একটি একটি প্রাচীন বটগাছকে ঘিরে। ব্রাহ্মণপাড়া মন্দিরের পাশে থাকা বিশাল বটগাছটি স্থানীয়দের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত এবং এলাকার অন্যতম প্রাচীন গাছ হিসেবে বিবেচিত। একপর্যায়ে গাছটি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলে সেটি রক্ষায় এগিয়ে আসেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। তিনি এক লাখ টাকা দিয়ে গাছটির স্বত্ব গ্রহণ করেন এবং পরে মন্দির ও গ্রামের স্কুলের নামে সেই স্বত্ব দিয়ে দেন। তার পরিকল্পনা ছিল, গাছটি যতদিন প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকবে ততদিন সেটি সংরক্ষিত থাকবে এবং স্বাভাবিকভাবে মারা গেলে এর সুবিধা সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠান সমানভাবে পাবে। একটি প্রাচীন বৃক্ষ রক্ষার এমন উদ্যোগও স্থানীয়দের কাছে তার সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। পৈতৃকভাবে সম্পদশালী পরিবারে জন্ম হলেও ব্যক্তিগত ভোগবিলাসকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য করেননি মোশাররফ। প্রবাসে দীর্ঘ সময় কাজ করেও পরিবারের জন্য বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার পরিবর্তে নিজের উপার্জনের বড় একটি অংশ এলাকার শিক্ষা ও মানবকল্যাণে ব্যয় করেছেন। স্ত্রী-সন্তানদের দেশে রেখে দীর্ঘ সময় বিদেশের মাটিতে থেকেছেন। জীবিকার প্রয়োজনে কখনো মেসে থেকেছেন, কখনো একাধিক কাজ করেছেন, আবার সেই উপার্জন সঞ্চয় করে দেশে পাঠিয়েছেন। চাইলে ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ার পথ তার জন্যও খোলা ছিল। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত ছিল অন্যরকম। নিজের নামে বাড়ি-গাড়ি কিংবা বিলাসী জীবনযাপনের পরিবর্তে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করেছেন। তার কাছে দান শুধু অর্থ দেওয়ার বিষয় নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার একটি উপায়। তার ভাষায়, “সবাই দান করতে পারেন না। আল্লাহ যার পক্ষে থাকেন, প্রকৃতিও তার পক্ষে থাকে। তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন, তাই এত কিছু করতে সক্ষম হয়েছি।” নিজের এই কাজকে তিনি একক কৃতিত্ব হিসেবেও দেখতে চান না। বরং ইতিহাসের বিভিন্ন ব্যক্তির আত্মত্যাগের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “এমন ত্যাগ শুধু আমি নই, বঙ্গবন্ধুও করেছেন, মহাত্মা গান্ধীও করেছেন। কাউকে তো করতেই হয়, নইলে পরবর্তী প্রজন্ম কীভাবে গড়ে উঠবে।” মোশাররফ হোসেনের কাছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রশ্নের উত্তরও একই জায়গায় গিয়ে থামে—শিক্ষা। প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাব্যবস্থাকে কীভাবে আরও মানসম্মত করা যায়, সেই লক্ষ্যেই তিনি কাজ করে যেতে চান। তার মতে, শুধু প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেখানে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করাও জরুরি। আর এই জায়গাটিই তার দীর্ঘ পথচলার পরবর্তী লক্ষ্য। একজন মানুষ কতটা সম্পদ নিজের জন্য রেখে গেলেন, সেই প্রশ্নের বাইরে গিয়ে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন আরেকটি প্রশ্ন সামনে আনে—নিজের উপার্জন ও সামর্থ্য দিয়ে একজন মানুষ তার সমাজের জন্য কতটা স্থায়ী পরিবর্তন তৈরি করতে পারেন। ১৯৭৪ সালে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় বাবাকে হারানো সেই শিশু উচ্চশিক্ষার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারেননি। জীবিকার প্রয়োজনে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। নিউইয়র্কের রাস্তায় ট্যাক্সিক্যাব চালাতে হয়েছে, ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করতে হয়েছে, নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে শ্রম দিতে হয়েছে। কিন্তু সেই শ্রমের অর্থের একটি বড় অংশ আবার ফিরে এসেছে নিজের শিকড়ের কাছে। সেই অর্থে তৈরি হয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন; স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত হয়েছে জমি; অসচ্ছল মানুষ পেয়েছে সহায়তা; একটি প্রাচীন বটগাছ পেয়েছে বেঁচে থাকার সুযোগ। তার হাতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রেণিকক্ষে আজ যে শিক্ষার্থীরা বসে, তাদের অনেকেই হয়তো জানে না তাদের শিক্ষার সুযোগ তৈরির পেছনে একজন প্রবাসীর কত বছরের শ্রম, ত্যাগ ও অপেক্ষা রয়েছে। তারা হয়তো শুধু একটি বিদ্যালয় বা কলেজকে দেখছে; কিন্তু এর পেছনে রয়েছে একজন মানুষের দীর্ঘ জীবনযাত্রার সিদ্ধান্ত। নিজের অপূর্ণ শিক্ষাজীবনের আক্ষেপকে তিনি অন্যদের জন্য সুযোগ তৈরির শক্তিতে পরিণত করেছেন—এটাই তার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি। একজন প্রবাসীর সাফল্যের গল্প সাধারণত তার নিজের বাড়ি, ব্যবসা কিংবা আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর ক্ষেত্রে সেই প্রচলিত গল্পটি কিছুটা ভিন্ন। তার প্রবাসজীবনের অর্জনের বড় একটি অংশ দৃশ্যমান হয়েছে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার শিক্ষাঙ্গনে। একটি গ্রামের শিক্ষার্থী থেকে একটি উপজেলার হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত তার কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি তৈরি হয়েছে কয়েক দশকের ধারাবাহিকতায়। তাই তার জীবনকে শুধু দানশীলতার গল্প হিসেবে দেখলেও পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এটি একই সঙ্গে প্রবাসী শ্রম, পারিবারিক মূল্যবোধ, শিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক বিনিয়োগের গল্প। একজন মানুষ তার জীবনে কত টাকা উপার্জন করেছেন, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে—তার উপার্জনের কতটা মানুষের কাজে লেগেছে। একজন মানুষ নিজের জন্য কতটি বাড়ি করেছেন, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—কতটি শিশুর জন্য তিনি শিক্ষার দরজা খুলেছেন। আর একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি হয়তো তার নিজের নামে থাকা সম্পদ নয়; বরং তার চলে যাওয়ার বহু বছর পরও যে প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের জীবন বদলাতে থাকবে, সেগুলোই হতে পারে তার প্রকৃত উত্তরাধিকার। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন সেই উত্তরাধিকারের একটি উদাহরণ হয়ে আছে। ধান্যদৌলের একটি পরিবারে জন্ম নেওয়া সেই মানুষটি জীবিকার প্রয়োজনে দেশ ছেড়েছিলেন, কিন্তু নিজের শিকড় থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। বিদেশের শ্রমের অর্থ দিয়ে দেশে ফিরিয়ে এনেছেন শিক্ষার অবকাঠামো। নিজের আরামের জীবনকে সীমিত রেখে অন্যের ভবিষ্যৎকে বড় করার চেষ্টা করেছেন। আর আজ তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হাজারো শিক্ষার্থীর পথচলা যেন বলে দেয়—একজন মানুষের ব্যক্তিগত ত্যাগ কখনো কখনো একটি পুরো জনপদের সামাজিক সম্পদে পরিণত হতে পারে। এই কারণেই মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর গল্প কেবল একজন প্রবাসীর জীবনী নয়; এটি একটি জনপদের শিক্ষাবিস্তার, ব্যক্তিগত ত্যাগ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার গল্প।

আপনার মতামত লিখুন

সময় বেলা

রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


রাজনীতি ও সামাজিক পরিচয়ের বাইরে তাঁর আরেক পরিচয়—একজন সমাজসেবক,ত্যাগে গড়া মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর অনন্য পথচলা

প্রকাশের তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

একজন মানুষের জীবনের সাফল্যকে আমরা সাধারণত অর্থ-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব দিয়ে বিচার করি। কিন্তু এমন কিছু জীবন আছে, যেগুলোর হিসাব করতে হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন মাপকাঠিতে। কতটা সম্পদ নিজের জন্য জমিয়েছেন—তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তিনি কতজন মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করেছেন, কতটি পরিবারের সন্তান শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে এবং একটি জনপদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তার শ্রম ও উপার্জন কতটা ভূমিকা রেখেছে। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামের মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনকে সেই ভিন্ন মাপকাঠিতে দেখলে সামনে আসে একজন প্রবাসীর দীর্ঘ সংগ্রাম, ব্যক্তিগত ত্যাগ এবং মানুষের জন্য কিছু করার এক অনবরত প্রচেষ্টার গল্প। উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েই জীবিকার সন্ধানে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। শৈশবেই হারিয়েছিলেন বাবাকে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে বড় সন্তান হিসেবে সংসারের বাস্তবতা তাকে খুব অল্প বয়সেই বুঝে নিতে হয়েছিল। নিজের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দীর্ঘায়িত করার সুযোগ না পেলেও পরবর্তী জীবনে অন্যদের শিক্ষার পথ প্রশস্ত করাকেই তিনি যেন নিজের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য করে নেন। কাতার থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক—প্রবাসজীবনের বিভিন্ন সময়ে তাকে জীবিকার জন্য নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে। ট্যাক্সিক্যাব চালিয়েছেন, ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করেছেন, নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে শ্রম দিয়েছেন। কিন্তু এসব কাজের আয়ের সঙ্গে তার আরেকটি হিসাব চলেছে নীরবে—কীভাবে সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে মানুষের জন্য কাজে লাগানো যায়। ১৯৬৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ও মোসাম্মাৎ আশেদা খাতুন চৌধুরী দম্পতির ঘরে জন্ম নেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রথম। মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯৭৪ সালে বাবা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী মারা যান। বাবার মৃত্যুতে পরিবারটির ওপর নেমে আসে অনিশ্চয়তা। মায়ের সংগ্রামী জীবন, ছোট ভাই-বোনদের ভবিষ্যৎ এবং সীমিত সামর্থ্যের সংসার খুব কাছ থেকে দেখেছেন মোশাররফ। আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় কোনোভাবে চলতে থাকে তাদের পরিবার। এই সময়ের অভিজ্ঞতাই তার পরবর্তী জীবনের চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ১৯৮৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর জীবিকার সন্ধানে কাতারে পাড়ি জমান তিনি। এরপর শুরু হয় তার দীর্ঘ প্রবাসজীবন। বিদেশের মাটিতে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি দেশের মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছাটিও ধরে রাখেন। ১৯৮৯ সালে দেশে ফিরে ধান্যদৌল গ্রামে বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেন আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়। একটি প্রত্যন্ত এলাকার শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরির এই উদ্যোগই পরবর্তী সময়ে তার দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রার ভিত্তি তৈরি করে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এরপর ১৯৯৪ সালে মা ও দাদির নামে প্রতিষ্ঠা করেন আশেদা-জোবেদা ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। শিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৯ সালে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সদরে প্রতিষ্ঠা করেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। বর্তমানে কলেজটিতে ১০টি বিষয়ে অনার্স পড়ানো হয় এবং প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়ন করছে। একই বছর উপজেলা সদরে প্রতিষ্ঠা করেন আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ। বর্তমানে সেখানে পাঁচ শতাধিক ছাত্রী পড়াশোনা করছে। মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এরপর ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মুমু রোহান কিন্ডার গার্টেন। প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটি তুলনামূলকভাবে কম সামর্থ্যের পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়। ফলে কয়েক দশকের ব্যবধানে ধান্যদৌল গ্রাম থেকে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সদর পর্যন্ত একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে তার উদ্যোগে। এসব উদ্যোগকে শুধু ভবন নির্মাণ বা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর মূল তাৎপর্যটি ধরা পড়ে না। কারণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা মানে শুধু একটি ভবন তৈরি করা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরিবার, অবকাঠামো, প্রশাসন এবং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। মোশাররফ হোসেনের উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও তাই শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বিচার করার সুযোগ রয়েছে। তার শিক্ষানুরাগের সূত্র খুঁজতে গেলে অবশ্য আরও কয়েক দশক পেছনে যেতে হয়। পরিবারের পূর্ববর্তী প্রজন্মের মধ্যেই ছিল শিক্ষার প্রতি এমন একটি দায়বদ্ধতা। তার বাবার দাদা মরহুম সিরাজ খান চৌধুরী ১৯৩৭ সালে নিজ গ্রাম ধান্যদৌলে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেই সেখানে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৭ সালে মোশাররফের বাবা মরহুম আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী রাঙামাটির মতো দুর্গম এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের এলাকা থেকে শিক্ষক নিয়ে গিয়ে সেখানে শিক্ষাদানের ব্যবস্থাও করেন তিনি। পরিবারের এই শিক্ষাবিষয়ক ঐতিহ্য মোশাররফের চিন্তা ও কর্মজীবনে প্রভাব ফেলেছে। তিনি নিজেও বলেছেন, মূলত বাবার স্কুল গড়ার স্বপ্নকে তিনি একে একে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি তিনি। জীবিকার প্রয়োজনে বছরের পর বছর দেশের বাইরে অবস্থান করলেও নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন এবং এগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার লক্ষ্য ছিল প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কেবল নামমাত্র টিকে না থাকে, বরং শিক্ষার মান ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দিক থেকেও এগিয়ে যায়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, তার প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে এমপিওভুক্ত হয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় আসে। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত রয়েছেন তিনি। শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের কিছু প্রতিফলন দেখা যায়। ২০১৪ সাল পর্যন্ত মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সেরা ২০টি কলেজের তালিকায় ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ২০১৭ সালে কলেজটির উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজে পাসের হার ছিল ৯৮ শতাংশ এবং আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়ে পাসের হার ছিল ৮৬ শতাংশ। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শিক্ষার মান বিচার করতে শুধু পরীক্ষার ফলাফলই একমাত্র মানদণ্ড নয়; শিক্ষকতার মান, অবকাঠামো, শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যও গুরুত্বপূর্ণ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই তার উদ্যোগের মূল্যায়ন করা যেতে পারে। শিক্ষা খাতের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবাতেও রয়েছে তার সহযোগিতার নজির। ২০১০ সালে ব্রাহ্মণপাড়া ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণে তিনি এক বিঘা জমি দান করেন। স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এর বাইরে অসচ্ছল মানুষের সহযোগিতা, গৃহহীনদের ঘর নির্মাণ, মসজিদ নির্মাণসহ বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তার সহযোগিতার কথা স্থানীয়রা জানান। তার জনহিতকর কর্মকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ঘটনাগুলোর একটি একটি প্রাচীন বটগাছকে ঘিরে। ব্রাহ্মণপাড়া মন্দিরের পাশে থাকা বিশাল বটগাছটি স্থানীয়দের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত এবং এলাকার অন্যতম প্রাচীন গাছ হিসেবে বিবেচিত। একপর্যায়ে গাছটি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলে সেটি রক্ষায় এগিয়ে আসেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। তিনি এক লাখ টাকা দিয়ে গাছটির স্বত্ব গ্রহণ করেন এবং পরে মন্দির ও গ্রামের স্কুলের নামে সেই স্বত্ব দিয়ে দেন। তার পরিকল্পনা ছিল, গাছটি যতদিন প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকবে ততদিন সেটি সংরক্ষিত থাকবে এবং স্বাভাবিকভাবে মারা গেলে এর সুবিধা সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠান সমানভাবে পাবে। একটি প্রাচীন বৃক্ষ রক্ষার এমন উদ্যোগও স্থানীয়দের কাছে তার সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। পৈতৃকভাবে সম্পদশালী পরিবারে জন্ম হলেও ব্যক্তিগত ভোগবিলাসকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য করেননি মোশাররফ। প্রবাসে দীর্ঘ সময় কাজ করেও পরিবারের জন্য বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার পরিবর্তে নিজের উপার্জনের বড় একটি অংশ এলাকার শিক্ষা ও মানবকল্যাণে ব্যয় করেছেন। স্ত্রী-সন্তানদের দেশে রেখে দীর্ঘ সময় বিদেশের মাটিতে থেকেছেন। জীবিকার প্রয়োজনে কখনো মেসে থেকেছেন, কখনো একাধিক কাজ করেছেন, আবার সেই উপার্জন সঞ্চয় করে দেশে পাঠিয়েছেন। চাইলে ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ার পথ তার জন্যও খোলা ছিল। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত ছিল অন্যরকম। নিজের নামে বাড়ি-গাড়ি কিংবা বিলাসী জীবনযাপনের পরিবর্তে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করেছেন। তার কাছে দান শুধু অর্থ দেওয়ার বিষয় নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার একটি উপায়। তার ভাষায়, “সবাই দান করতে পারেন না। আল্লাহ যার পক্ষে থাকেন, প্রকৃতিও তার পক্ষে থাকে। তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন, তাই এত কিছু করতে সক্ষম হয়েছি।” নিজের এই কাজকে তিনি একক কৃতিত্ব হিসেবেও দেখতে চান না। বরং ইতিহাসের বিভিন্ন ব্যক্তির আত্মত্যাগের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “এমন ত্যাগ শুধু আমি নই, বঙ্গবন্ধুও করেছেন, মহাত্মা গান্ধীও করেছেন। কাউকে তো করতেই হয়, নইলে পরবর্তী প্রজন্ম কীভাবে গড়ে উঠবে।” মোশাররফ হোসেনের কাছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রশ্নের উত্তরও একই জায়গায় গিয়ে থামে—শিক্ষা। প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাব্যবস্থাকে কীভাবে আরও মানসম্মত করা যায়, সেই লক্ষ্যেই তিনি কাজ করে যেতে চান। তার মতে, শুধু প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেখানে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করাও জরুরি। আর এই জায়গাটিই তার দীর্ঘ পথচলার পরবর্তী লক্ষ্য। একজন মানুষ কতটা সম্পদ নিজের জন্য রেখে গেলেন, সেই প্রশ্নের বাইরে গিয়ে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন আরেকটি প্রশ্ন সামনে আনে—নিজের উপার্জন ও সামর্থ্য দিয়ে একজন মানুষ তার সমাজের জন্য কতটা স্থায়ী পরিবর্তন তৈরি করতে পারেন। ১৯৭৪ সালে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় বাবাকে হারানো সেই শিশু উচ্চশিক্ষার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারেননি। জীবিকার প্রয়োজনে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। নিউইয়র্কের রাস্তায় ট্যাক্সিক্যাব চালাতে হয়েছে, ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করতে হয়েছে, নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে শ্রম দিতে হয়েছে। কিন্তু সেই শ্রমের অর্থের একটি বড় অংশ আবার ফিরে এসেছে নিজের শিকড়ের কাছে। সেই অর্থে তৈরি হয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন; স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত হয়েছে জমি; অসচ্ছল মানুষ পেয়েছে সহায়তা; একটি প্রাচীন বটগাছ পেয়েছে বেঁচে থাকার সুযোগ। তার হাতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রেণিকক্ষে আজ যে শিক্ষার্থীরা বসে, তাদের অনেকেই হয়তো জানে না তাদের শিক্ষার সুযোগ তৈরির পেছনে একজন প্রবাসীর কত বছরের শ্রম, ত্যাগ ও অপেক্ষা রয়েছে। তারা হয়তো শুধু একটি বিদ্যালয় বা কলেজকে দেখছে; কিন্তু এর পেছনে রয়েছে একজন মানুষের দীর্ঘ জীবনযাত্রার সিদ্ধান্ত। নিজের অপূর্ণ শিক্ষাজীবনের আক্ষেপকে তিনি অন্যদের জন্য সুযোগ তৈরির শক্তিতে পরিণত করেছেন—এটাই তার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি। একজন প্রবাসীর সাফল্যের গল্প সাধারণত তার নিজের বাড়ি, ব্যবসা কিংবা আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর ক্ষেত্রে সেই প্রচলিত গল্পটি কিছুটা ভিন্ন। তার প্রবাসজীবনের অর্জনের বড় একটি অংশ দৃশ্যমান হয়েছে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার শিক্ষাঙ্গনে। একটি গ্রামের শিক্ষার্থী থেকে একটি উপজেলার হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত তার কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি তৈরি হয়েছে কয়েক দশকের ধারাবাহিকতায়। তাই তার জীবনকে শুধু দানশীলতার গল্প হিসেবে দেখলেও পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এটি একই সঙ্গে প্রবাসী শ্রম, পারিবারিক মূল্যবোধ, শিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক বিনিয়োগের গল্প। একজন মানুষ তার জীবনে কত টাকা উপার্জন করেছেন, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে—তার উপার্জনের কতটা মানুষের কাজে লেগেছে। একজন মানুষ নিজের জন্য কতটি বাড়ি করেছেন, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—কতটি শিশুর জন্য তিনি শিক্ষার দরজা খুলেছেন। আর একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি হয়তো তার নিজের নামে থাকা সম্পদ নয়; বরং তার চলে যাওয়ার বহু বছর পরও যে প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের জীবন বদলাতে থাকবে, সেগুলোই হতে পারে তার প্রকৃত উত্তরাধিকার। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন সেই উত্তরাধিকারের একটি উদাহরণ হয়ে আছে। ধান্যদৌলের একটি পরিবারে জন্ম নেওয়া সেই মানুষটি জীবিকার প্রয়োজনে দেশ ছেড়েছিলেন, কিন্তু নিজের শিকড় থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। বিদেশের শ্রমের অর্থ দিয়ে দেশে ফিরিয়ে এনেছেন শিক্ষার অবকাঠামো। নিজের আরামের জীবনকে সীমিত রেখে অন্যের ভবিষ্যৎকে বড় করার চেষ্টা করেছেন। আর আজ তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হাজারো শিক্ষার্থীর পথচলা যেন বলে দেয়—একজন মানুষের ব্যক্তিগত ত্যাগ কখনো কখনো একটি পুরো জনপদের সামাজিক সম্পদে পরিণত হতে পারে। এই কারণেই মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর গল্প কেবল একজন প্রবাসীর জীবনী নয়; এটি একটি জনপদের শিক্ষাবিস্তার, ব্যক্তিগত ত্যাগ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার গল্প।


সময় বেলা

সম্পাদক
আবু সাউদ মাসুদ
বার্তা প্রকাশক
তিয়ান

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
রাজনীতি ও সামাজিক পরিচয়ের বাইরে তাঁর আরেক পরিচয়—একজন সমাজসেবক,ত্যাগে গড়া মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর অনন্য পথচলা
0:00 / 0:00
1x