সময় বেলা

সাইফুল ইসলাম

সাইফুল ইসলাম

স্টাফ রিপোর্টার

যোগদান: 3 জুন, 2026

সোনারগাঁয়ে স্কুল দখল নিয়ে তোলপাড়

নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়া রেজাউল করিমের পরিবার রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হলেও, ক্ষমতার দাপটে এমপির নাকের ডগায় এক প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী ‘হোসেনপুর শম্ভুপুরা পিরিজপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়’-এর সভাপতি পদ কালো টাকা ও তদবিরের জোরে বাগিয়ে নিয়েছেন রেজাউলের ভাই, দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।এলাকাবাসীর প্রশ্ন—সোনারগাঁয়ে বর্তমান এমপি মান্নান থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বিগত নির্বাচনে জামানত হারানো একটি পরিবার প্রশাসনের সব নিয়ম ভেঙে স্কুল দখল করে নেয়? এমপি মান্নান কি তবে তাঁর নিজের এলাকায় রেজাউল পরিবারের কাছে পাত্তাই পাচ্ছেন না? আরও পড়ুন : সোনারগাঁয়ে স্কুল দখল নিয়ে তোলপাড়অনুসন্ধানে জানা যায়, গত মে মাসে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ ওমর ফারুক মিয়াজী এবং সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত মিলে ৩ জন যোগ্য ও পরিচ্ছন্ন ব্যক্তির একটি প্যানেল তৈরি করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে শিক্ষা বোর্ডে পাঠান। স্থানীয় প্রশাসন তদন্ত করে এই ৩ জনকে ‘ক্লিন চিট’ দেয়। এই প্যানেলের প্রতি বর্তমান সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানেরও পরোক্ষ সবুজ সংকেত ছিল বলে জানা যায়।কিন্তু তালিকায় নিজের নাম না দেখে বিগত নির্বাচনে মাত্র ৪ হাজার ভোট পেয়ে জামানত হারানো রেজাউল করিমের ভাই বজলুর রহমান। তিনি গত ১৩ মে উল্টো এমপি মান্নানের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে মনগড়া ও মিথ্যা অভিযোগ এনে একটি আলাদা দরখাস্ত জমা দেন।আশ্চর্যের বিষয় হলো, নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রায়হান কবির এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আলীনূর খান কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই বজলুর সেই বিতর্কিত দরখাস্ত শিক্ষা বোর্ডে ফরোয়ার্ড করেন। আর গত ৮ জুন ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সরকারি সব নিয়ম এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট পরিপত্র লঙ্ঘন করে মূল ৩ জনের প্যানেল বাতিল করে ৪ নম্বর ব্যক্তি হিসেবে ঋণখেলাপি বজলুকে সভাপতি ঘোষণা করে।বজলুর রহমান এই সভাপতি পদ বাগিয়ে নেওয়ার পর তাঁর অনুসারীরা এলাকায় প্রচার করছে যে, “এমপি মান্নান সাহেব চাইলেও আমাদের আটকাতে পারেননি।” এতে করে সোনারগাঁয়ে এমপির অনুসারী ও সাধারণ নেতা-কর্মীদের মাঝে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তৃণমূলের অনেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এমপি সাহেব সোনারগাঁয়ের অভিভাবক হওয়া সত্ত্বেও যদি একটা স্কুলের কমিটি তাঁর অবাধ্য এবং বিগত নির্বাচনে পরাজিত শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে মাঠ পর্যায়ে আমাদের মুখ দেখানোর জায়গা থাকে না।”স্কুলের বৈধ ৩ জনের নাম বাদ দিয়ে কেন ৪ নম্বর ব্যক্তি বজলুর রহমানকে সভাপতি করা হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও এডিসি সরাসরি দায় এড়িয়ে যান। এডিসি আলীনূর খান এক বিস্ফোরক স্বীকারোক্তিতে বলেন, “বজলুর রহমান দরখাস্ত ছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো কাগজই আমাদের কাছে দেননি, আমরা যাচাই-বাছাই করব কীভাবে।”প্রশাসনের এমন বক্তব্য প্রমাণ করে, কোনো রকম স্থানীয় ক্লিয়ারেন্স বা যাচাই ছাড়াই শুধুমাত্র বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন বা অন্য কোনো অদৃশ্য তদবিরের জোরে এমপি মান্নানকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করতেই এই বেআইনি কমিটি পাস করানো হয়েছে।ব্যাংক ঋণখেলাপি, যার বি আর স্পিনিং মিলসের কাছে শুধু জনতা ব্যাংকেরই পাওনা প্রায় ৫৭৪ কোটি টাকা, সেই বিতর্কিত ব্যক্তি কোন সাহসে এমপির নির্দেশনা ও প্রশাসনের নিয়ম ভেঙে স্কুলের চেয়ারে বসেন—তা নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা ও স্থানীয় অভিভাবকরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।সোনারগাঁয়ের সচেতন মহল মনে করছেন, নিজের রাজনৈতিক সম্মান ও এলাকায় একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হলে এমপি আজহারুল ইসলাম মান্নানকে এখনই এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১৬ মার্চের পরিপত্র অনুযায়ী বোর্ড যে স্পষ্ট আইন লঙ্ঘন করেছে, তা তুলে ধরে এমপি যদি সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর আধা-সরকারি পত্র (উঙ খবঃঃবৎ) পাঠান, তবে এই অবৈধ কমিটি বাতিল হতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় লাগবে। এখন দেখার বিষয়, জামানত হারানো রেজাউল পরিবারের এই প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জের জবাবে এমপি মান্নান তাঁর রাজনৈতিক পাওয়ার দেখান, নাকি নিজের এলাকায় রেজাউল পরিবারের কাছে ‘পাত্তা না পেয়ে’ নীরবে বসে থাকেন।

সোনারগাঁয়ে স্কুল দখল নিয়ে তোলপাড়