উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
মো. শাহজাহান বাশার, মহানগর প্রতিনিধি ||
জামালপুর পৌরসভা নির্বাচন কবে হবে, এখনো তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। নির্বাচন কমিশনও ঘোষণা করেনি তপশিল। কিন্তু এরই মধ্যে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের তৎপরতায় সরগরম হয়ে উঠেছে শহরের রাজনৈতিক অঙ্গন। ব্যানার-পোস্টার, উঠান বৈঠক, গণসংযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার—সব মিলিয়ে ভোটের মাঠে যেন আগাম নির্বাচনী আবহ।বিশেষ করে বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী নিয়ে দলের ভেতরে একাধিক নেতার সক্রিয়তায় প্রতিযোগিতা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, দলীয় মনোনয়ন ঘিরে এই প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, সেটিই এখন জামালপুরের রাজনীতিতে বড় প্রশ্ন। আর বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিজেদের জন্য রাজনৈতিক সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও অন্যান্য দল।জামালপুর পৌরসভা প্রথম শ্রেণির। পৌরসভার আয়তন ৫৩ দশমিক ২৮ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৯ জন। ভোটার রয়েছেন ৯৬ হাজার ৩৫৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৪৬ হাজার ৯১৩ এবং নারী ভোটার ৪৯ হাজার ৪৪৪ জন। ১২টি ওয়ার্ডের এই পৌরসভায় রয়েছে ৭৬টি মহল্লা ও ৪২টি ভোটকেন্দ্র।বিএনপিতে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীদলীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি থেকে অন্তত ৮ থেকে ১০ জন নেতা সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খান এবং শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাসুদ।দুই নেতার অনুসারীরাই বিভিন্ন কর্মসূচি, গণসংযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করছেন।তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছে, সাংগঠনিক তৎপরতা ও তরুণ কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে সোহেল রানা খান শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে শাহ মাসুদের নামও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।এ ছাড়া জিএস ফিরোজ আহমেদ, রিশাদ রোদোয়ান বাবু, শামীম আহমেদ, শুভ পাঠানসহ আরও কয়েকজনের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ঘুরছে।পুরোনো বিরোধ কি আবারও সামনে?জামালপুর বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই নানা মতপার্থক্য রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জেলা পর্যায়ে নেতৃত্বের প্রশ্নে সেই বিরোধ আরও প্রকাশ্য রূপ নেয় বলে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।জেলা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, বিক্ষোভ, মশাল মিছিল এমনকি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অডিও-ভিডিও, বক্তব্য এবং পাল্টা বক্তব্যের মাধ্যমে দলীয় অভ্যন্তরীণ মতবিরোধও সামনে এসেছে।যদিও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিভিন্ন সময়ে ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ে এর প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ।তাদের মতে, পৌরসভা নির্বাচনে যদি একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়, তাহলে সেটি ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে।মাসুদের দাবি, কোন্দল নয়—এটি প্রতিযোগিতাসম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী শাহ মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ছিলেন। দলের কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের নিয়ে রাজপথে থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।তার ভাষায়, দল তার রাজনৈতিক ভূমিকা ও ত্যাগ মূল্যায়ন করবে—এমন প্রত্যাশা তার রয়েছে।পৌরসভার প্রধান সমস্যা হিসেবে ড্রেনেজ ও পানি নিষ্কাশনের সংকটকে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হলে নাগরিক দুর্ভোগ কমানোর বিষয়টিকেই অগ্রাধিকার দেবেন।বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একাধিক ব্যক্তি মনোনয়ন চাইতেই পারেন। এটিকে তিনি কোন্দল হিসেবে না দেখে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন।তার দাবি, শহর ও ওয়ার্ড পর্যায়ের বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ তার সঙ্গে রয়েছে। দল মনোনয়ন দিলে বিজয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।তরুণ নেতৃত্বের ওপর জোর সোহেলেরঅন্যদিকে জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খানও নির্বাচনের প্রস্তুতিতে পিছিয়ে নেই। তার বক্তব্য, জামালপুরকে আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে তুলতে নাগরিকদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তিনি।সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ সংকট, যানজট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার কথা জানান তিনি।সোহেল রানা খান বলেন, দলীয় মনোনয়ন পেলে জনগণের প্রত্যাশাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করবেন এবং নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।বিএনপির মাঠে জামায়াতের নজরবিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তৎপরতার পাশাপাশি জামালপুর পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে মাঠ গোছাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীও। দলটির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমানের নাম আলোচনায় রয়েছে।তিনি বলেন, নির্বাচনে জয়লাভ গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনগণের আস্থা অর্জনকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভোটারদের প্রত্যাশাতেও পরিবর্তন এসেছে। এখন তারা দলীয় পরিচয়ের বাইরে সৎ, যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিকে মূল্যায়ন করতে চাইছেন।তবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বা বিভক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতি করার অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং দলের কর্মসূচি সামনে রেখেই তারা ভোটারদের কাছে যাবেন।তরুণ ভোটারই বড় ফ্যাক্টর এনসিপিরজাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকেও সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। দলীয় সূত্রে আবিদ সৌরভের নাম সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।আবিদ সৌরভ বলেন, তিনি এনসিপির হয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জামালপুরকে আধুনিক ও তরুণবান্ধব পৌরসভায় রূপান্তরের লক্ষ্যে ৩৬ দফা পরিকল্পনা করেছেন।তার পরিকল্পনায় নাগরিক সেবার বিভিন্ন কার্যক্রম অনলাইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তরুণদের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।নির্বাচনে জোট নাকি এককভাবে অংশ নেওয়া হবে—এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দল নেবে বলেও জানান তিনি।নাগরিকদের প্রত্যাশা উন্নয়ন ও সেবায়রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যেই সাধারণ ভোটারদের বড় অংশের প্রত্যাশা নাগরিক সেবা ঘিরে।নতুন ভোটারদের অনেকে বলছেন, এবার তারা শুধু দলীয় পরিচয় বা প্রচার-প্রচারণা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে চান না। শহরের যানজট, পানি নিষ্কাশন, পরিচ্ছন্নতা, ড্রেনেজ এবং কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে চান তারা।শহরের একাধিক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের পানি ও ড্রেনেজ সংকট, অতিরিক্ত রিকশা, যানজট এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তাদের প্রধান সমস্যা।এক তরুণ ভোটারের ভাষায়, ‘পোস্টার বা শোডাউন নয়, যে প্রার্থী বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দিতে পারবেন, ভোটের সময় তাকেই গুরুত্ব দেওয়া হবে।’তপশিলের অপেক্ষায় প্রার্থীরাএদিকে জামালপুর জেলা নির্বাচন অফিস জানিয়েছে, এখনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা হয়নি। পৌরসভা নির্বাচনের কার্যক্রমও তপশিল ঘোষণার পর শুরু হবে।জেলা নির্বাচন অফিসার মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক বলেন, স্থানীয় নির্বাচনগুলোর মধ্যে আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর পৌরসভাসহ অন্যান্য স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।ফলে এখন পর্যন্ত প্রার্থীদের তৎপরতা অনেকটাই সম্ভাব্যতা ও দলীয় মনোনয়নকেন্দ্রিক। তপশিল ঘোষণার পরই নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ আরও স্পষ্ট হবে।রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জামালপুর পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত করাই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশীর মধ্যে সমঝোতা হলে বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে। আর বিভক্তি থেকে গেলে সেটিই জামায়াত, এনসিপি কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।তবে শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে কে কতটা শক্তিশালী—তার উত্তর মিলবে তপশিল ঘোষণা, দলীয় মনোনয়ন এবং প্রার্থীদের চূড়ান্ত প্রচারণা শুরু হওয়ার পরই।