উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
সাদনান আল নূর তিয়ান, বিশেষ প্রতিবেদক ||
আগামী বাজেটে বড় মাথাব্যথা হচ্ছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি। বাড়তি দামে বিদ্যুৎ এবং এলএনজি কিনতে ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গত তিন মাসে লোকসান করেছে ১২ হাজার কোটি টাকা। সেই লোকসানের টাকা বিশেষ বরাদ্দ হিসাবে দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আবেদন করেছে বিপিসি। তবে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে আগামী বাজেটে কত টাকা বরাদ্দ রাখা হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সরকার বিপিসিকে কোনো ভর্তুকি দিবে না। এলএনজি আমদানির জন্য গতবারের মতো ৬-৭ হাজার কোটি টাকা প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ রাখা হতে পারে। মিধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধ না হলে এ ভর্তুকি আরও বাড়তে পারে।জানা গেছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবারের বাজেটে যে ৭৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি চেয়েছে, এর মধ্যে শুধু বিদ্যুৎ বিভাগ ভর্তুকি চেয়েছে ৪৯ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ সচিব মিনারা মাহরুখ যুগান্তরকে বলেন, ভর্তুকি নিয়ে সরকার কাজ করছে।সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ভর্তুকির কারণে দেশের অর্থনীতি দারুণ চাপে আছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বাংলাদেশকে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তেল, গ্যাস এবং বিদ্যুতের জন্য কয়লা আমদানির বিল আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।বরাবরের মতো এবারের বাজেটেও সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির কারণে সরকারের লোকসান হয় ৫২ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, এবার এ লোকসান ঠেকবে ৬৫ হাজার কোটি টাকায়। এর মধ্যে গড়ে প্রায় ১৭ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে সরকারের রাজস্ব বাড়বে ১২ হাজার কোটি টাকা। বাকি ৫৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৪৯ হাজার কোটি টাকা অর্থ বিভাগের কাছে চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে বলে জানা গেছে।পিডিবি জানিয়েছে, বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে বিতরণ কোম্পানি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে তাদের খরচ হয় প্রতি ইউনিট ১৩ টাকা। দাম বাড়ানোর পরও তাদের গড় বিক্রি মূল্য হচ্ছে প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৩৯ পয়সা। এ কারণে বড় লোকসানে পড়ছে পিডিবি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হিসাব অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদানিকে এক বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে ৫ হাজার ৩৫৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা, বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ২০ হাজার ৫৮৮ কোটি, আরএনপিএল পায়রা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ৪ হাজার ৩৮৯ কোটি, চীন বাংলাদেশ পায়রা কেন্দ্রকে ৪ হাজার ৬২৭ কোটি, রামপাল কেন্দ্রকে ৪ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ক্রয়ে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে ৫ টাকা ৪৬ পয়সা।বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী জুনের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে বড় মাথাব্যথা হবে গ্যাসভিত্তিক ইউনাটেড আনোয়ারা ৬০০ মেগাওয়াট এবং নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশনের ৮০০ মেগাওয়াটের রুপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়েকটি কেন্দ্র। এগুলো এ বছরের মধ্যে উৎপাদনে আসছে। কিন্তু কোনো গ্যাস নেই। বরং যে গ্যাস আছে তা দিনদিন কমছে। এসব বড় কেন্দ্রের জন্য বড় অঙ্কের ভর্তুকি বরাদ্দ রাখার আহ্বান জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।বিপিসির চিঠি : বিপিসি জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি চিঠি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেল কিনে লোকসান দিয়েছে কমপক্ষে ১২ হাজার কোটি টাকা। দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে বিপিসির জমা ছিল (বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য) ৩৮ হাজার কোটি টাকা। সেই টাকা কমে এখন হয়েছে ২৬ থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা।জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুপারিশে বিপিসি ৩টি পরামর্শ দিয়েছে। তিন মাসে লোকসানের টাকা ফেরত দেওয়া অথবা প্রতি লিটার জ্বালানি তেল আমদানিতে এনবিআর শুল্ক নেয় ৩৬ টাকা। যুদ্ধ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ওই শুল্ক আদায় বন্ধ অথবা আন্তর্জাতিক বাজারদরে জ্বালানি তেল বিক্রির সুযোগ করে দেওয়া। অর্থাৎ তেলের দাম বাড়ানো।গ্যাস খাতে ২৬ হাজার কোটি ভর্তুকি দাবি : জানা গেছে, চাহিদা মেটাতে সরকার গেল বছর ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি এলএনজি আমদানি করে। এবার মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এই ব্যয় ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে। যুদ্ধ না থামলে আগামী অর্থবছরে এলএনজি আমদানির খরচ কত গিয়ে বাড়বে তা বলতে পারছেন না পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা। তবে জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে এলএনজি আমদানির জন্য ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসের ভর্তুকি ৪ হাজার ৩৩ কোটি টাকার বেশি। ডিসেম্বরের পর কী হবে তা এখনো বলতে পারছেন না কর্মকর্তারা।পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর দেশে গ্যাস সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতি ইউনট গ্যাসের বিক্রয়মূল্য ২৬ টাকা। কিন্তু কিনতে হচ্ছে (আমদানি এবং দেশীয় উৎপাদিত গ্যাস) ৩১ টাকার মতো। এই ৫ টাকা প্রতি ইউনিটে লোকসানের কারণে পেট্রোবাংলাকে প্রতি মাসে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান দিতে হচ্ছে। গত অর্থবছরে পেট্রোবাংলার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল মাত্র ৬ হাজার কোটি টাকা।কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিয়েছে।এলএনজি আমদানি করে সরকারি প্রতিষ্ঠান আরপিজিসিএল। ওই সংস্থার কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে-আগে এক কার্গো এলএনজি আমদানি ব্যয় হতো ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার, সেখানে এখন হচ্ছে প্রায় ৬ কোটি ডলার। দেশে দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি হচ্ছে ১০০ কোটি ঘনফুট।