উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
সাদনান আল নূর তিয়ান, বিশেষ প্রতিবেদক ||
এক সময় শিল্পনগরী ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসেবে পরিচিত ছিল নারায়ণগঞ্জ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও মাদককেন্দ্রিক সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জনমনে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁ ও শহরাঞ্চলে একের পর এক ভয়াবহ ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে?সম্প্রতি ফতুল্লার বক্তাবলী এলাকায় দুই শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে দুটি মামলা হয়েছে। ঘটনাগুলো প্রকাশ্যে আসার পর পুরো এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা দুই অভিযুক্তকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে।এর আগে সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া এলাকায় গভীর রাতে বাড়িতে ঢুকে নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুটের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের দাবি, এটি শুধুমাত্র ডাকাতি নয়; পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।শুধু এই ঘটনাগুলোই নয়। গত কয়েক মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই, সন্ত্রাসী হামলা, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এবং মাদকসংক্রান্ত সংঘর্ষ বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জে অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাদক বিস্তার। ফতুল্লা, গাবতলী, মাসদাইর, ইসদাইর ও সিদ্ধিরগঞ্জের কিছু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সিন্ডিকেটকে কেন্দ্র করেই কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয় হচ্ছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াইও বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি হয়ে প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। এতে সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বেকারত্ব ও সামাজিক অবক্ষয়ই বড় কারণ। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যক নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ বসবাস করেন। কিন্তু তাদের সন্তানদের বড় একটি অংশ শিক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এই সুযোগে কিশোরদের একটি অংশ মাদক, টিকটক গ্যাং ও অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ছে।সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে শিশু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনাও জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। রাজধানীতে শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নারায়ণগঞ্জে দুটি শিশু ধর্ষণের অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ইতোমধ্যে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে।তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান চলছে। পুলিশ বলছে, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনতে তারা কাজ করছে। কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন-অভিযান যদি চলমানই থাকে, তাহলে অপরাধ কমছে না কেন?সচেতন মহলের মতে, শুধুমাত্র অভিযান দিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, কিশোরদের সামাজিক পুনর্বাসন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। তা না হলে শিল্পসমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ ধীরে ধীরে ভয় ও অনিরাপত্তার নগরীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।